অমর সেই মুসলিম বিজ্ঞানী আল বেরুনি- মাওলানা জামিল


এই বিচিত্রময় পৃথিবী বহু রঙ্গের সমন্বয়ে সাজিত হয়েছে। আর এই বৈচিত্রময় বিচিত্র রং দিয়ে দশ শতাব্দীর ও একাদশ শতাব্দীর যে সকল মহামনষীদের অবদানে এই পৃথিবী সাজিত হয়েছে তথা জ্ঞান ও বিজ্ঞানে পৃথিবী কয়েক দাপ এগিয়ে গিয়েছিল। সে সকল মহামনষীদের মধ্যে মুসলিম মহামনষী আল বেরুনি অন্যতম ছিলেন। আল বেরুনি বহু জ্ঞান-বিজ্ঞান সভ্যতার ইতিহাস, সাগরতত্ত¡, আকাশ তত্ত¡, ও মৃত্তিকাতত্ত¡ মানব জাতির জন্য অবদান হিসেবে রেখে গেছেন। ইউরোপিয় পন্ডিত গনের মতে আল বেরুনি নিজেই বিশ্বকোষ। এক কথায় তিনি ছিলেন বিচিত্র প্রতিভার অধিকারি। জ্যোতি বিজ্ঞান,পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা বিজ্ঞান, জীব তত্ত¡, উদ্ভিদ তত্ত¡, গনিত, দর্শন, ন্যায় শাস্ত্র,সভ্যতার ইতিহাস, ধর্ম তত্ত¡ প্রভৃতি বিষয়ে তিনি ছিলেন অগাদ পান্ডিত্যের অধিকারি । এছাড়াও তিনি বিভিন্ন ভাষার উপর গভীর জ্ঞান রাখতেন। বলা যায় যে, একজন ভাষাবিদ হিসেবে তিনি ছিলেন বিখ্যাত।

 আরবি, ফারসি, গ্রীক,সংস্কৃতি, হিব্রæ,সিরিয়া ইত্যাদি ভাষার উপর তার ছিল গভীর পান্ডিত্য। ত্রিকোনমিতিতে তিনি বহু তত্ত¡ আবিস্কার করেন। কোপার্নিকাস বলেছিলেন-পৃথিবীসহ গ্রহ গুলো সূর্য্যকে প্রদক্ষিন করে। অথচ কোপার্নিকাসের  জন্মের ৪২৫ বছর পূর্বেই আল বেরুনি বলেছেন বৃত্তিক গতিতে পৃথিবী ঘুরে। তিনিই শব্দের সাথেই আলোর গতির  পার্থক্য নির্ণয় করেছিলেন। তিনি এরিস্টলের হেভেন  গ্রন্থের একশটি ভুল আবিস্কার করেছিলেন। সু² ও শুদ্ধ গণনায় আল বেরুনী একটি বিস্ময়কর পন্থা আবিস্কার করেন। যার বর্তমান নাম ঞযব ঋড়ৎসড়ষধ ড়ভ রহঃবৎঢ়ড়ষধঃরড়হ পাশ্চাত্যের পন্ডিতগন এটিকে নিউটনের আবিস্কার বলে প্রচার করার চেষ্টা চালাচ্ছেন । অথচ নিউটনের জন্মের ৫৯২ বছর পূর্বেই মুসলিম বিজ্ঞানী আল বেরুনি এটি আবিস্কার করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানেও এই মহান ব্যক্তির  যুগ সাফল্য অবদান রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে তিনি একটি অমূল্য গ্রন্থ  রচনা করেন।  আর তাতে  তিনি বহু রোগের কলা কৌশল বর্ণনা করেন। বিজ্ঞানী আল বেরুনি বিজ্ঞান, যুক্তি বিদ্যা, ইতিহাস, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেন। বিভিন্ন বিজ্ঞানের মধ্যে অনেকেই আল বেরুনির প্রশংসায় পঞ্চমুখর হন। অধ্যাপক হামার নেহ বলেছেন- আল বেরুনী শুধু মুসলিম জগতেরই নয় পৃথিবীর সমস্ত সভ্য জগতের। আল বেরুনীই প্রথম ব্যক্তি, যিনি খৃষ্টপূর্ব কাল থেকে তার সময় কাল পর্যন্ত বিভিন্ন ঔষদ তৈরি করার পদ্ধতি ও তার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই মহান ব্যক্তি সম্পর্কে ইতিহাসের অমর পাতা থেকে যতদূর জানা যায় ৩৬২ হিজরীর তিন জিলহজ্জ্ব মোতাবেক ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের ৩ ই সেপ্টেম্বর রোজ বৃহস্পতিবার খাওয়ারিজমের শহর তলীতে জন্মগ্রহন করেন। তার আসল নাম ছিল। আবু রায়হান আর ইতিহাসে তিনি আল বেরুনি নামে প্রসিদ্ধ। তার বাল্য কাল অতিবাহিত হয়েছিল ইরাকীয় বংশীয় রাজপতি আবু মনসুর বিন আলী বিন ইরাকের তত্ত¡াবধানে। এখানে তিনি দীর্ঘ ২২ বছর রাজকীয় অনুগ্রহে কাটিয়েছিলেন। সেখানে অবস্থান কালেই ধীরে ধীরে তার বিচিত্র  প্রতিভা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। মৃত্যুর ১৩ বছর পূর্বে তিনি তার  রচিত গ্রন্থের তালিকা পৃথিবীবাসির কাছে পেশ করেছেন। সে অনুযায়ী তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ১১৪ টি। পরবর্তী ১৩ বৎসরে তিনি আরো বহু গ্রন্থ রচনা করেন। এছাড়াও তার  উল্লেখযোগ্য  গ্রন্ত্র হচ্ছে ‘কিতাবুত তাফহিম’। এটি  ৫৩০অধ্যায়ে বিভক্ত। এতে অংক জ্যামিতি ও বিশ্বের গঠন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ‘আল আছারুল বাকিয়া’ এটিতে পৃথিবীর প্রাচীন কালের ইতিহাস তোলে ধরা হয়েছে। ‘ইফরাদুল ফাল ফিল আমরিল আযলাল’ এটিতে জ্যোর্তিবিজ্ঞানের ছায়াপথ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আল আছারুল বাকিয়া আলাল কুবানিল কালীয়া পৃথিবীর প্রাচীন কালের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। আলাল ফি যিজে খাওয়ারিজমি’ যুক্তিবিদ্যা সম্পর্কে তার উল্ল্যেখযোগ্য গ্রন্থ। এত বিশাল পুস্তক কিভাবে একজনের পক্ষে যা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের প্রতিটির জাতির জন্য একান্ত প্রয়োজন তা কিভাবে বা কত সাধনার মাধ্যমে লিখা যায়, তা ভাবতেও অবাক লাগে। তাই বলা যায় আল  বেরুনি ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট জ্ঞানীদের একজন। তার ও অন্যান্য  মুসলিম মহাবিজ্ঞানীদের মৌলিক আবিস্কারের উপরই গড়ে উঠেছে আধুনিক বিজ্ঞান। সে মহান বিজ্ঞানী আল বেরুনি আজ আমাদের মাঝে বেচে নেই, কিন্তু বেচে আছে তার রেখে যাওয়া পৃথিবী বাসির সে আবিস্কার । তাই বেচে না থাকলেও তার কাজের মধ্যে বেঁেচ থাক তার নাম হাজার বছর। যতদিন এই পৃথিবী থাকবে ততদিন বেচে থাকবে মুসলিম মহামনষী ১০ শতাব্দী শেষ এবং একাদশ শতাব্দীতে যার একান্ত সাধনায় জ্ঞান বিজ্ঞানের দিগন্তে এক নব সুর্যের আলোতে উদ্ভাসিত হয়েছিল সে প্রতীপ্ত সূর্য আল বেরুনী। তিনি মহান আল্লাহকে সকল জ্ঞানের উৎস ক্ষমতার উৎস মনে করতেন। ৬৩ বছর বয়সে তিনি কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর দিকে দাবিত হতে থাকেন। অবশেষে ৪৪০ হিজরীর ২ রজব মোতাবেক ১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ১২ ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার  ৭৫ বছর বয়সে আবু রায়হান মোহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বেরুনী মালিকের ডাকে সাড়া দিয়ে ইহদম ত্যাগ করেন। 


লেখক: হাফেজ মাওলানা আহসান জামিল
প্রভাষক, আইয়ুব হেনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।
খতিব, আইয়ুব হেনা পলিটেকনিক জামে মসজিদ।


কোন মন্তব্য নেই

Featured post

কবি মারুফ হোসাইন এর কবিতা -“ আমার শ্রেষ্ঠ মা বাবা”। ”।

প্রাণের চেয়ে ও প্রিয় তোমরা  আমার অতি আপন জন। তোমাদের না দেখিলে এক নজর  হয়ে যায় ব্যাকুল এই অন্তর। দেখিয়েছ পৃথিবীর আলো আসিলাম অবিনশ্বর পৃথিবীত...

Blogger দ্বারা পরিচালিত.